"অন্তিম পর্ব" (১ম পর্ব)


সাঁঝের বাতি নিভিয়ে ধীর পায়ে হাঁটতে লাগল রূপালী। তারপর....
তারপর যে কি লিখবেন, ভেবে উঠতে পারলেন না ধীমানবাবু। গত এক মাস ধরে এই গল্পটা একটু একটু করে লিখে চলেছেন তিনি। কখনও গল্পে দিয়েছেন শান্ত জীবনের অশান্ত প্রলাপ আবার কখনও দিয়েছেন সাংঘাতিক মোড়। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র রূপালী নামক এক মেয়ের জীবনে চড়াই-উতরাই নিয়েই এই গল্প। প্রথমটা যখন লিখতে শুরু করেছিলেন তখন ভাবেননি এটা এত দূর এগোবে। কিন্তু কালের গতিতে গ্ল্পরথের চাকাকে ক্রমাগত ঘোরাতে ঘোরাতে উনি নিজেই যে কখন কালিতে ডুবে গেছেন বুঝতেই পারেননি। রোজই সকাল বিকেল দুবেলা দু ঘন্টা করে লেখেন, আর একের পর এক নতুন গল্পের সৃষ্টি হয়। লেখার সময় ধীমানবাবু একটা আশ্চর্য্য জিনিস লক্ষ্য করেন বটে, তাঁর হাত খাতায় স্পর্শ করা মাত্রই, ঝরঝর করে কলম চলতে থাকে। তারপর নিজের থেকে একসময় থেমেও যায়। এটাকে অবশ্য বেশি আমল না দিয়ে ধীমান চ্যাটার্জী নিজের প্রতিভার বড়াই করে বলেন, "মাঝে মাঝে লেখকদের ওরকম একটু হয়, হে হে হে।"
             ধীমানবাবু অকৃতদার। বিয়ে না করে একদিকে যেমন নিজেকে পরম ভাগ্যবান বলে মনে করেন, তেমনি আরেকদিকে কোনো কন্যাসন্তান না থাকায় বড়ই কষ্ট পান। তিনি বলেন, "আর যাই হোক, মেয়ের বাবা হওয়া হল না।" পাড়ায় এ নিয়ে অনেকে অনেক কিছু বলে তবে ওনার মেয়েদের প্রতি বাবাসুলভ আচরনটা দেখে আর কারোর কিছু বলার থাকে না। এতটাই স্নেহের চোখে উনি মেয়েদের দিকে তাকান, যে অচেনা কোনো মানুষও যে চেয়ে আলাপ করতে আসে। ধীমানবাবুর ডেইলি রুটিনে বিকেলে হাঁটার অভ্যাস আছে। আর প্রতিদিন তিনি হেঁটে ফিরবার পথে একবার হলেও ড. সেনের চেম্বার হয়ে ফেরেন। ড. সেন তাঁর গুণগ্রাহী ও স্বাস্থ্যপরামর্শদাতা দুটোই। তাঁর সাথে আধ ঘন্টা  আড্ডা না মারলে  ধীমানবাবুর চলে না। তাই এদিনও বিকেলে তিনি হাজিরা দিলেন ড. সেনের চেম্বারে।
         
           আজ অবস্থা কিছুটা অন্যরকম। অন্যদিন হলে ডাক্তার আগে থেকেই সকল রুগীদের বিদায় দিয়ে চেয়ার খালি করে রাখেন। কিন্তু এবারে একটি পেসেন্টকে দেখতে পেলেন ধীমানবাবু। প্রায় পাঁচ মিনিট কথাবার্তা চলবার পর তিনি পেসেন্টকে মুক্তি দিলেন। ধীমানবাবু দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁরই সামনে দিয়ে একটি যুবতী মাথা নিচু করে বেরিয়ে গেল। প্রথমটা ধীমানবাবু তার মুখখানা দেখতে পাননি। পরে এক ঝলক দেখেই মুখ দিয়ে একটা অস্ফুট স্বর বের হয়ে এল।
- রুপালি!
এর কিছুক্ষণ পরেই ড. সেন ধীমানবাবুকে ডেকে বললেন,
- কি? চেনেন নাকি মেয়েটিকে?
- কই না তো!
- বললেই হল! ওর নামটা তবে দেখেই বলে দিলেন কীকরে!!
এবার ধীমানবাবুর চমকানোর পালা। উনি ব্যাপারটা সামলে নিয়ে বললেন,
- আরে না না। আমি ওকে চিনি না। আসলে আমি একটা গল্প লিখছি গত এক মাস ধরে, সেটার মুখ্য চরিত্রকে আমি যেরকম বর্ননা করেছি, এ অবিকল তারই মত। তাই মুখ ফস্কে নামটা বেরিয়ে এল আর কি!
- "ও, এই ব্যাপার!" ডা: সেন চোখ থেকে চশমা খুলে রেখে বললেন, "তারপর? সব ঠিকঠাক তো?"
- হ্যাঁ সবই চলছে ওই একরকম। তা আজ আবার পেশেন্ট বেশি ছিল নাকি?
- না না। গতকালের থেকে কম।
- তাহলে এই পেসেন্টকে দেখতে আপনার এত সময় লাগল কেন? সিরিয়াস কিছু?
- সেটা এখনও বলতে পারছি না। তবে রোগটা ভারী অদ্ভুত।
- কিরকম?
- গত এক মাস ধরে ওর এই রোগ দেখা দিয়েছে। রোজ সকালে ও বিকেলে দু ঘন্টা করে ও নিজের মধ্যে থাকে না।
- থাকে না মানে?
- মানে অন্য জগতে চলে যায়। তারপর যখন জ্ঞান ফেরে, তখন দ্যাখে অদ্ভুত এক অবস্থানে সে দাঁড়িয়ে আছে। এই তো  সেদিন কমল মিত্তিরকে ঠাটিয়ে এক চর মেরেছিল। তারপর যখন জ্ঞান ফেরে তখন দেখে, তার নিজের মা কমল মিত্তিরের হাতে পায়ে ধরে ক্ষমা চাইছে।
- কমল মিত্তির মানে, যে সুদের কারবারি করে?
- আজ্ঞে হ্যাঁ।
- সে তো শুনেছি আচ্ছা বজ্জাত লোক মশাই!
- হ্যাঁ ঠিকই শুনেছেন। ওই মানুষটা ভালো না। যুবতী মেয়ে দেখলে তাঁর নাকি জিভ লকলক করে।
- যাক গে ওসব কথা। আপনি বলুন, কোনো উপায় হল?
- কার? রূপলির? না না। আমি তো ছাই বুঝতেই পারছি না কি কারণে রোগটা হল।
- পরীক্ষানিরীক্ষা করেছেন কিছু?
- প্রেসার, হৃৎস্পন্দন সবই তো মাপলাম, কোথাও কিছু পেলাম না।
- যাঃ বাবা। এত তাজ্জব ব্যাপার। রোগীর রোগের কোনো কারণ নেই অথচ রোগ হয়?
- আমার মনে হয় এটা নিয়ে আরেকটু ভাবা উচিৎ। মেয়েটাকে বড় কোনো ডাক্তারের কাছে রেফার করতে হবে। রোগটা সুবিধের ঠেকছে না।
কিছুক্ষন নীরবতা বিরাজ করল। এমন সময় হঠাৎই ধীমানবাবুর মনে কি এক ভাবনার উদয় হল।  উনি বলে বসলেন,
- আচ্ছা, রূপলির পদবী কি?
- মিত্র। কিন্তু কেন?
- বলছি। তার আগে এটা বলুন তো, ওর আজ সকালে ও বিকেলে ঠিক কটার সময় মাথা রোগটা দেখা দিয়েছিল?
- ও তো বলল, আজ সকালে দশটা নাগাদ ওর মাথা ঝিমঝিম করে উঠেছিল, তারপর আর কিছু মনে নেই। যখন জ্ঞান ফিরল তখন বাজছে বারোটা মত। আর বিকেলেও একই জিনিস তিনটে থেকে পাঁচটা।  কিন্তু আপনি এসব জানতে চাইছেন কেন?
চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন ধীমানবাবু। বললেন, "আমার শরীরটা আজ ভালো লাগছে না। আমি আসি।"
বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন তিনি। তাঁর কপালে চিন্তার ভাঁজ। তাঁর কেবলই মনে হচ্ছে, " গল্পের রুপালি আর বাস্তবের রুপালি কি এক? গল্পেও রুপালি এরকম দেখতে, বাস্তবেও তাই। গল্পেও সে এক মহাজনকে চড় কসিয়েছে, বাস্তবেও তাই। গল্পে তার মা ক্ষমা চেয়েছে, বাস্তবেও তাই।" আর সবথেকে বড় বিষয়,
রূপালির রোগ আজ তখনই দেখা দিয়েছিল যখন উনি লিখতে বসেছিলেন। আবার সেরেও গিয়েছিল যখন ওনার লেখা শেষ হয়েছিল! "
               
                                           ~ ঋদ্ধি
পরবর্তী পর্ব আসছে খুব শিগগিরই।


Comments